আমার কাছে তো এরকম নি:স্বার্থ নেতা নাই, ডাক্তারও নাই

বেগম খালেদা জিয়া দু:খ করে বলেছেন, ‘আমার দলে কোনো জিল্লুর রহমান নেই, কোনো মোদাচ্ছের আলীও নেই। থাকলে এতোদিন, এভাবে জেলে থাকতে হতো না।’ নাজিম উদ্দিন রোডের কারাগারে একজন ডেপুটি জেলারের কাছে তিনি ঐ মন্তব্য করেন। ডেপুটি জেলার বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে তার পছন্দের চিকিৎসকদের নামের তালিকা জানতে চেয়েছিলেন। নামের তালিকা দেওয়ার সময় বেগম জিয়া ঐ মন্তব্য করেন। ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেনের সময় ড. ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করেন।

সে সময় জিল্লুর রহমান দলের হাল ধরে দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছিলেন। আর ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে তার সুচিকিৎসার জন্য সোচ্চার হয়েছিলেন। চোখের চিকিৎসক হয়েও অধ্যাপক মোদাচ্ছের আলী শেখ হাসিনার সার্বিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কথা বলতেন। তার উদ্যোগেই ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত, ডা. এ.বি.এম আবদুল্লাহ এবং ডা. শায়লা খাতুনের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠিত হয়েছিল। ঐ মেডিকেল বোর্ড শেখ হাসিনার উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে পাঠানোর সুপারিশ করেছিল। শেখ হাসিনাকে সুচিকিৎসা না দেওয়ার প্রতিবাদে ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী একাই তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টাকে স্বারক লিপি দিতে গিয়েছিলেন। সেই ঘটনা গুলো স্মরণ করে, বেগম জিয়া ডেপুটি জেলারকে বললেন, ‘আমার কাছে তো এরকম নি:স্বার্থ নেতা নাই, ডাক্তারও নাই। আছে শুধু স্বার্থপরের দল।’

পরে অবশ্য বেগম জিয়া কয়েকজন চিকিৎসকের নাম দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষ। চিকিৎসকরা দুই একদিনের মধ্যে বেগম জিয়ার ব্যক্তিগত পছন্দের চিকিৎসকরা তাকে দেখবেন।
বোর্ডের পরামর্শে ওষুধ খাচ্ছেন না খালেদা
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য মেডিকেল বোর্ড গঠন করেছিল সরকার। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চারজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সমন্বয়ে এ বোর্ড গঠন করা হয়। বোর্ডের ডাক্তাররা গত রোববার খালেদা জিয়াকে দেখে গেছে এবং কারা কর্তৃপক্ষের কাছে গত মঙ্গলবার রিপোর্টও দিয়েছেন। কিন্তু বোর্ডের সেই ডাক্তারদের পরামর্শ অনুযায়ী, ওষুধ গ্রহণ করছেন না বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ দাবি করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের কারাগারে যেতে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা খালেদা জিয়াকে কিছু নতুন ওষুধ সেবনের পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু খালেদা জিয়া তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ নিতে চাইছেন না। তাই তারা মনে করছেন, খালেদা জিয়াকে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চার সদস্যের মেডিকেল বোর্ড খালেদা জিয়ার এক্স-রে ও রক্ত পরীক্ষার সুপারিশ করেছে। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন গত মঙ্গলবার কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছেছে। কারা কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি হাসপাতাল থেকে প্রতিবেদনটি নিয়ে যান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, মেডিকেল বোর্ডের প্রতিবেদনটি হাতে পেয়েছি। প্রতিবেদনে যে সুপারিশ করা হয়েছে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সুপারিশ অনুযায়ী, সরকারি যে কোনো একটি ভালো হাসপাতালে খালেদা জিয়াকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে নেওয়া হতে পারে। এ ছাড়া হয়তো তার ব্যক্তিগত চিকিৎসককে কারাগারে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে।

বোর্ডের পরামর্শে ওষুধ
মেডিকেল বোর্ডে থাকা সংশ্লিষ্ট একজন চিকিৎসক বলেন, আমরা রোববার খালেদা জিয়াকে দেখতে কারাগারে গিয়েছিলাম। কারাগারের যে পর্যন্ত গিয়েছিলাম, সেখান থেকে ৫০ গজ দূরে থাকেন খালেদা জিয়া। তিনি আমাদের কাছে হাঁটুতে ভর দিয়ে আসেন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে যখন ব্যবস্থাপত্র লেখা হয়, তখন তিনি (খালেদা জিয়া) ডাক্তারদের জানান, জেলখানা থেকে আমাকে যেসব ওষুধ দেওয়া হয়েছিল সেসব খেয়ে কোনো কাজ হয়নি।
জানা গেছে, খালেদা জিয়া আগে থেকেই হাই ব্লাড প্রেসার, ডায়াবেটিস, আথ্রাইটিজ (শরীরের জয়েন্টে ব্যথা) এবং কন্ডোলাইসিসে ভুগছেন।

খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষা সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ডপ্রধান ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. শামসুজ্জামান জানান, খালেদা জিয়ার দুই হাঁটু প্রতিস্থাপন করা। তার হাঁটুতে এখন যে ব্যথা তা বয়স থেকে হতে পারে। আগের অপারেশনের জেরে হতে পারে, আবার নতুন হতে পারে। তার কোমর ও ঘাড়ে বড় ধরনের কোনো সমস্যা আছে কি না, তা জানতে সিটি স্ক্যান বা এমআরআই করানো লাগতে পারে। তার ব্যথা কেবল শিনশিন-ঝিনঝিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাকি হাড় পর্যন্ত পৌঁছেছে তা জানতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।

কারাগারে পাঠানো খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যবিষয়ক রিপোর্টে কি আছে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে এমন প্রশ্নের জবাবে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। যা বলার মন্ত্রী বলবেন।

Facebook Comments