উচ্চ মাধ্যমিক উপবৃত্তি প্রকল্পে ভাগাভাগি লুটপাট

উচ্চ মাধ্যমিক উপবৃত্তি প্রকল্পে (এইচএসএসপি) লুটপাট চলছে। ওয়েবসাইট তৈরি, সার্ভার স্থাপন, ডাটা এন্ট্রিসহ বিভিন্ন কাজের অর্থ নানা ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই (অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন) প্রকল্পের বরাদ্দ অর্থ পর্যন্ত রক্ষা পাচ্ছে না। কর্মশালা ও ট্যুর আয়োজনের নামে ভুয়া ভাউচার ও প্রতিবেদন দাখিল করে অর্থ নেয়ার অভিযোগও রয়েছে। ঈদের ছুটিতে ব্যক্তিগত ভ্রমণকে দাফতরিক দেখিয়েও অর্থ তুলে নেয়া হচ্ছে। এছাড়া প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) বিরুদ্ধে সড়কপথে ভ্রমণে গিয়ে বিমান ভাড়া নেয়া এবং বাসায় অফিসের একাধিক কর্মচারীকে কাজে লাগানোর অভিযোগও আছে। অফিসের সবক’টি গাড়ি পরিবারের সদস্য এবং আত্মীয়স্বজনের পেছনে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রকল্পের অর্থে কেনা টিসুসহ বিভিন্ন টয়লেট্রিজ সামগ্রী, পানির ফিল্টারও পিডির বাসায় ব্যবহার করা হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা এক অভিযোগপত্র এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের উপবৃত্তি দেয়ার লক্ষ্যে রাজস্ব বাজেট থেকে অর্থের সংস্থান করে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। সম্প্রতি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে টাকা বিতরণ শুরু হয়েছে। নানা ত্রুটির কারণে বিভিন্ন উপজেলায় অনেকেই এ অর্থ পাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের এ মূল কাজের দিকে তেমন নজর নেই প্রকল্পের কর্তাব্যক্তিদের। বরং কীভাবে প্রকল্পের বিভিন্ন খাতের অর্থ বা কেনা সামগ্রী লুটপাট করা যাবে, সেদিকেই নজর বেশি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। তাদের আরও অভিযোগ, ‘অর্ধেক পিডির অর্ধেক ডিপিডির’- এ তত্ত্বে চলছে প্রকল্পটি। ২০০৯ সাল থেকে একই পদে থাকা উপপ্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) সব ধরনের অন্যায়-অনিয়মে পিডির সহযোগীর ভূমিকা পালন করছেন বলেও দাবি সংশ্লিষ্টদের। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্পের পিডি শ্যামা প্রসাদ বেপারি যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রকল্পের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ঠিক মতো অফিস করেন না। আমি তাদের ধরায় আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গায় অপপ্রচার চালাচ্ছেন। অভিযোগের সবই মিথ্যা-বানোয়াট।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করি। কাজ করলে তর্ক-বিতর্ক থাকেই। কিন্তু ভালো কাজটি বলা উচিত।’ আর ডিপিডি শ ম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘কোনো কাজই শতভাগ শুদ্ধ হয় না। একটু এদিক-ওদিক হতেই পারে। তা ধরা উচিত নয়।’ জানা গেছে, প্রকল্পের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী পিডির বিরুদ্ধে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে একটি অভিযোগ দাখিল করেছেন। তিন পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে ১৬টি দিক উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ খতিয়ে দেখতে পরে অভিযোগপত্রটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেই তদন্ত আজও শেষ হয়নি।

তবে এমন কোনো তদন্ত কমিটি গঠিত হয়নি বলে জানিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) ড. অরুনা বিশ্বাস। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘এমন কোনো কমিটির দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়েছে বলে মনে পড়ছে না। বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখব।’

অভিযোগপত্রের সূত্র ধরে অনুসন্ধানে নেমে আরও বেশকিছু তথ্য পাওয়া যায় প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে। একজন জানান, উপবৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের তথ্য সংরক্ষণের জন্য একটি ওয়েবসাইট তৈরি করা হয়। এজন্য ৩৪ লাখ ১৫ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্প অফিসে একটি সার্ভার স্থাপন করা হয়। কিন্তু সার্ভার বক্সের ভেতরে একটি পরিত্যক্ত কি-বোর্ড ছাড়া কোনো যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রুনিক সামগ্রী নেই, যা কেনার কথা বলা হচ্ছে। সার্ভার বক্সে কিছু না থাকলেও তা দেখাশোনার জন্য মাসে ৪৫ হাজার টাকা বেতনে একজনকে রাখা হয়। বিগত অর্থবছরে কোনো প্রশিক্ষণ না হওয়া সত্ত্বেও এ খাতে একজনকে বিশেষজ্ঞ দেখিয়ে তার স্বাক্ষর জাল করে ৯০ হাজার টাকা তোলা হয়।

যুগ্ম সচিব হিসেবে প্রাধিকার বলে সুদমুক্ত ঋণে গাড়ি কিনেছেন প্রকল্পের পিডি। ওই গাড়ির জন্য প্রতিমাসে ৪৫ হাজার টাকা করে রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা অফিস থেকে নেন। ফলে তার অফিসের গাড়ি ব্যবহারের কথা নয়। কিন্তু তিনি অফিসের দুটি গাড়িই (জিপ নম্বর ঘ-১৫-২৩৭৩ এবং মাইক্রোবাস চ-৫১-১৭৮০) দখলে রেখেছেন, যা তার এবং পরিবারের সদস্যরা অধিকাংশ সময় ব্যবহার করেন।

এর প্রমাণ হিসেবে দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলেন, গত বছর ঈদুল আজহার সময় প্রকল্পের পিডি ভারতে ভ্রমণে যান। তখন তার এক মেয়ে জিপটি (নম্বর ২৩৭৩) নিয়ে ভ্রমণে বের হয়ে গরুর ট্রাকের সঙ্গে দুর্ঘটনার শিকার হন। প্রকল্পের প্রায় ২৫ হাজার টাকা ব্যয়ে পরে ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িটি মেরামত করা হয়। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, পিডি যদি বিদেশ থাকেন, তাহলে গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়ে কীভাবে। ওই ঘটনায় পরিবারের সদস্য কর্তৃক সরকারি গাড়ি ব্যবহারের প্রমাণ মেলে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

এদিকে পিডির বিরুদ্ধে ঢাকার বাইরে কোথাও অফিসের জিপ গাড়িতে গিয়েও বিমান ভাড়া নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ১৯-২১ মে তিনি খাগড়াছড়ির পানছড়িতে জিপে যান। কিন্তু নেন বিমান ভাড়া। এর আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। আবার ভুয়া ট্যুর দেখিয়ে ভ্রমণ-জ্বালানি বিল নেয়ার অভিযোগও আছে। ২০১৬ সালের রোজার ঈদের ছুটিতে এবং এ বছর একই ঈদে খুলনায় ব্যক্তিগত ভ্রমণে যান। কিন্তু দুটিই সরকারি ভ্রমণ দেখিয়ে ভাতা ও জ্বালানি বিল নিয়েছেন পিডি। জানা গেছে, পিডির বাড়ি পিরোজপুর। ২০১৫ সালের ১৫ মার্চ থেকে এ বছরের ২ জুলাই পর্যন্ত পিডির ৪৫টি ট্যুরের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১২টিই করেন পিরোজপুরে। পিডির সঙ্গে এক ধরনের প্রতিযোগিতা করে ডিপিডি এবং একজন মহিলা সহকারী প্রকল্প কর্মকর্তাও (এপিডি) ভ্রমণের নামে ভুয়া বিল নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

এছাড়া নিয়মবহির্ভূতভাবে পছন্দের প্রতিষ্ঠান দিয়ে প্রকল্পের ডাটা এন্ট্রির কাজ করানো ও টেন্ডারে ঘাপলা, অপ্রয়োজনে গাড়ি কেনা, অস্বাভাবিক জ্বালানি খরচ, মুদ্রণ, গাড়ি মেরামতের ব্যয় ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কর্মচারীদের চাকরিচ্যুতি, কর্মচারীদের পিডির বাসায় কাজ করানো, প্রকল্পের অর্থে কেনা টিসুসহ বিভিন্ন টয়লেট্রিজ সামগ্রী, পানির ফিল্টার, প্রিন্টার, টোনার ইত্যাদি ব্যবহারসহ নানা অভিযোগ রয়েছে পিডির বিরুদ্ধে। প্রকল্পের মাধ্যমে এটুআই প্রকল্পের অধীন ১০ উপজেলায় শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের অর্থ ব্যয়ে লুটপাটের অভিযোগও আছে।

পিডির বক্তব্য : এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পিডি যুগান্তরকে বলেন, এ প্রকল্পে কিছু লোক আছে যারা চাকরি না করে বেতন নিতে চান। তাদের ভুয়া বিল-ভাউচার অনুমোদন না করলে আমাকে ফাঁসিয়ে দেয়ার হুমকি দেন। তিনি বলেন, সার্ভারের ভেতরে যন্ত্রপাতি আছে। এটা রক্ষণাবেক্ষণে যে লোক ছিল সে ঠিক মতোই বেতন-ভাতা নিয়েছে। কর্মশালা হয়েছে বলেই সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞকে সম্মানী দেয়া হয়েছে। পিপিআর মেনেই কোটেশনে ডাটা এন্ট্রির কাজ দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটেনি। গাড়ি দুটি প্রকল্পের কর্মকর্তারাই ব্যবহার করেন, কেউ বাসার কাজে ব্যবহার করেন না। আমার বাসায় প্রকল্পের কাউকে কাজ করানো হয় না। আর কর্মচারী নিয়োগ করা হয়েছে আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে। তারা যদি কাউকে টাকা দিয়ে থাকেন, তা আমাদের জানার কথা নয়।’

প্রকল্পের অর্থে কেনা দ্রব্যাদি বাসায় নেয়ার কথাও অস্বীকার করেন তিনি। গাড়িতে গিয়ে বিমান ভাড়া নেয়ার অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে পিডি বলেন, ‘আমরা ট্যুরে যাই একটু-আধটু লাভ হয় বলেই। জ্বালানি কোথা থেকে নিয়েছি, সেটা কথা নয়। কাজটি হয়েছে কিনা, সেটাই দেখার বিষয়।’

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *